লোকশিল্পের বিকাশ নাকি আধুনিক অট্টালিকার জাঁকজমক?
গাজী মোবারক
মেঠোপথ, খড়ের চাল, বাঁশ-বেতের বুনন আর গ্রামবাংলার প্রান্তিক শিল্পীদের ঘামের গন্ধে যে স্বপ্নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, তা আজ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ইট, কাঠ আর কংক্রিটের রাজকীয় প্রাসাদের নিচে। সোনারগাঁয়ে অবস্থিত ‘বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন’ নামমাত্র লোক ও কারুশিল্পের ধারক হলেও, ভেতরে ঢুকলে মনে হয় এ যেন এক আধুনিক প্রাসাদ শিল্প। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের যে কালজয়ী স্বপ্ন নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের পথচলা শুরু হয়েছিল, কর্তৃপক্ষের হঠকারী ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের নামে তা আজ মাটির নিচে চাপা পড়তে বসেছে।
জানা যায়, ১৯৭৫ সালে সোনারগাঁয়ের প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিবেশে মেধা ও কায়িক শ্রমের সমন্বয়ে লোকশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের বিলুপ্তপ্রায় ও ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্প, বাঁশ-বেতের কাজ, মাটি ও কাঠের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী এবং প্রান্তিক কারুশিল্পীদের জীবনযাত্রাকে টিকিয়ে রাখা ও বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা। কিন্তু সরেজমিনে ফাউন্ডেশন এলাকা ঘুরে সেই রূপ আর চোখে পড়ে না। চারপাশের মেঠোপথ গায়েব হয়ে গেছে, জায়গা করে নিয়েছে আধুনিক দৃষ্টিনন্দন কিন্তু ঐতিহ্যহীন ইটের হাঁটার পথ।
পুরো চত্বর ঘুরে এখন আর বাঁশ, বেত কিংবা ছন বা খড়ের তৈরি ঐতিহ্যবাহী কোনো ঘর খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। যেখানে সাধারণ গ্রাম্য কুটিরে বসে কারুশিল্পীরা তাঁদের হাতেনাতে কাজ প্রদর্শন করার কথা, সেখানে শত শত কোটি টাকা খরচে গড়ে তোলা হয়েছে আধুনিক রাজকীয় প্রাসাদ ও দালানকোঠা। লোকজ ছোঁয়া যেখানে থাকার কথা ছিল শতভাগ, সেখানে আজ আধুনিক স্থাপত্যের জয়জয়কার।
এমনকি পরিবেশের সাথে মানানসই ঐতিহ্যবাহী বাঁশের সাঁকো বা সেতুগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। তার জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে ভারী কংক্রিটের আধুনিক সেতু। ফলে লোকজ রূপটি হারিয়ে তা পুরোপুরি একটি যান্ত্রিক পার্ক বা আধুনিক পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
যে কারুশিল্পীদের টিকিয়ে রাখার জন্য এই ফাউন্ডেশন, তারাই আজ এখানে সবচেয়ে অবহেলিত। হাতে গোনা কয়েকজন শিল্পীকে শুধু প্রদর্শনীর খাতিরে নামমাত্র স্টল দেওয়া হলেও, অধিকাংশ ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পী উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। লোকশিল্পের গবেষণা, সংরক্ষণ ও শিল্পীদের সরাসরি সহায়তার চেয়ে প্রবেশ টিকিট, পার্কিং এবং আধুনিক বিনোদনের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়কেই কর্তৃপক্ষ মূল লক্ষ্য বানিয়ে ফেলেছে। বিশাল বাজেট ও লুটপাট করে কর্মকর্তারা আজ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অনায়াসে। এমনকি ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কপোরেট কম্পানীর বিজ্ঞাপন তৈরির জন্য ভাড়া দিচ্ছে তারা।
অথচ অর্ধাহারে, অনাহাতে কাটছে লোকশিল্পীদের জীবন। বংশানুক্রমে যারা মৃতশিল্প, নকশী কাঁথা, জামদানি, কাঠের ভাস্কর্য বা বাঁশ-বেতের কাজ ধরে রেখেছেন, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফাউন্ডেশন থেকে তাদের জীবনমান উন্নয়নে বা বিপণনে উল্লেখ করার মতো কোনো দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।
উন্নয়নের নামে ঐতিহ্য ধ্বংসের এই প্রক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ লোকশিল্প অনুরাগী ও স্থানীয় সচেতন মহল। সুশীল সমাজের মতে— লোক ও কারুশিল্পের মূল সৌন্দর্যই ছিল এর প্রাকৃতিক ও গ্রামীণ আবহ। শত কোটি টাকার কংক্রিটের কাঠামো বানিয়ে হয়তো পর্যটক আকর্ষণ করা যাবে, কিন্তু জয়নুল আবেদিনের আত্মাকে হত্যা করা হচ্ছে। এটি এখন আর লোকশিল্প জাদুঘর নয়, বরং একটি যান্ত্রিক রিসোর্টে পরিণত হয়েছে।
সোনারগাঁয়ের লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনকে আধুনিক অট্টালিকায় রূপান্তর করার চেয়ে জরুরি ছিল প্রান্তিক কারুশিল্পীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্পের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। কর্তৃপক্ষ যদি এখনো লোকজ আবহ ফিরিয়ে না আনে এবং কৃত্রিম ‘প্রাসাদ কালচার’ থেকে বের হয়ে না আসে, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প শুধু বইয়ের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর শত কোটি টাকার এই ভবনগুলো হয়ে থাকবে ঐতিহ্যের এক একটি সমাধিস্তম্ভ।


আপনার মতামত জানান