ঈদের ছুটিতে দাউদাউ করে জ্বলছে চুন কারখানার অবৈধ গ্যাসের আগুন
বিশেষ প্রতিনিধি:
ঈদের ছুটির সুযোগ নিয়ে সোনারগাঁয়ের অবৈধ চুন কারখানাগুলোতে দাউদাউ করে চলছে গ্যাসের আগুন। সারাদেশে তীব্র জ্বালানি সংকটে যখন বৈধ কারখানাগুলো পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এরই মধ্যেও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে গড়ে উঠেছে শতাধিক চুন ও ঢালাই কারখানা। বারবার প্রশাসনিক অভিযানের পরও বন্ধ হচ্ছে না উপজেলার মেঘনা শিল্পনগরী, পিরোজপুর, মোগরাপাড়া, কাঁচপুর, সাদিপুর ও সোনারগাঁ পৌরসভা এলাকার এসব কারখানা। ঈদের ছুটিতে অভিযান বন্ধ থাকায় কারখানাগুলোতে অনেকটা ‘চোর-পুলিশ’ খেলার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ছত্রছায়ায় সোনারগাঁয়ে ব্যাপকহারে বেড়েছে চুন উৎপাদন কারখানা। উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের আষাঢ়িয়ার চর এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বিএনপি ও যুবদলের নেতাদের নেতৃত্বে গঙ্গানগর এলাকায় একটি পরিত্যক্ত গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে চুন কারখানা গড়েছেন এবং পিয়ারনগর গ্রামে দুটি ঢালাই কারখানা করেছেন। ইসলামপুর এলাকায় আরও একটি কারখানা গড়ে তোলার সময় স্থানীয়রা হামলা করে চুনের ভাট্টি ভেঙে দেন। এ ছাড়া প্রতাপেরচরে আরও একটি চুন কারখানা রয়েছে।
একই ইউনিয়নের পিরোজপুর গ্রামে মোজাফফর আলী ফাউন্ডেশনের পাশে ও ইউনিয়ন পরিষদের বিপরীত দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের এক বিএনপি নেতা দুটি কারখানা গড়ে তুলেছেন। পিরোজপুর ইউনিয়ন বিএনপির এক নেতা ও তাঁর ভাই তাদের বাড়ির পাশে দুটি ঢালাই কারখানা গড়ে তুলেছেন।
রতনপুর এলাকায় দুটি ঢালাই কারখানা, সোনারগাঁ পৌরসভার দত্তপাড়া এলাকায় চারটি, দুলালপুর এলাকায় সুরুজ মেম্বারের বাড়ির পাশে, আদমপুর এলাকায় চুন কারখানা, কাঁচপুর ইউনিয়নের চেঙ্গাইন এলাকায় সাতটি ঢালাই কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে।
এছাড়াও সাদিপুর ইউনিয়নে দুটি, জামপুর ইউনিয়নের মিরেরটেক বাজার এলাকায় একটি এবং মোগরাপাড়া ইউনিয়নে কয়েকটি কারখানা গড়ে উঠেছে। প্রতিটি কারখানা চলে অবৈধভাবে সংযোগ নেওয়া গ্যাস ব্যবহার করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক রাজনৈতিক নেতা জানান, নেতাকর্মীদের আয়ের অন্য কোন খাদ না থাকায় চুন ও ঢালাই কারখানার দিকে ঝুঁকছে। এ কারখানা থেকে যা আয় হয় তা থেকে তিতাস ও থানার অসাধু কর্মকর্তা, অপসাংবাদিক, স্থানীয় প্রভাবশালী সহ দলের বড় ভাইদের দিয়ে যা থাকে তা দিয়ে ছোট ভাইদের পকেট খরচ চলে আসে। কিন্ত বার বার অভিযান চালানোর কারনে লোকসান গুনতে হয়।
আষাঢ়িয়ারচর গ্রামের আবুল হোসেন ও শফিকুল ইসলাম জানান, এ এলাকায় ২০টির বেশি কারখানা গড়ে উঠেছে। ফলে বাসা বাড়িতে গ্যাস পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। রান্নাবান্নায় সমস্যা হচ্ছে। স্থানীয়রা প্রতিবাদ করলেই হামলার শিকার হতে হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চুন কারখানায় পাথর গলানোর কারণে পরিবেশ দূষণ হয়। বাতাসে সিসার পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে আশপাশের মানুষের শ্বাসকষ্ট, শরীরে চর্ম রোগসহ নানা প্রকার রোগ দেখা দেয়। নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এলাকার কৃষিতেও।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে অবৈধ কারখানার মালিকানাও বদল হচ্ছে, তবে অবৈধ কার্যক্রম থামছে না। জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অনুমোদনহীন এসব কারখানা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। এসব কারখানা পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা ও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন, শুধু সাময়িক অভিযান যথেষ্ট নয়।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে কারখানা মালিকদের যোগসাজশ থাকার অভিযোগ স্থানীয়দের। তারা বলছেন, আঁতাতের ফলে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি পরিবেশেরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি মেঘনাঘাট জোনাল অফিস সূত্র জানায়, প্রতিটি অবৈধ চুন ও ঢালাই কারখানায় মাসে গড়ে ৪৭ লাখ টাকার গ্যাস ব্যবহার হয়ে থাকে। এ হিসেবে এসব কারখানায় মাসে ১০ কোটি টাকার বেশি সরকারি গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে।
পৌরসভা এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চুন কারখানার মালিক জানান, তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সখ্য রেখেই তারা এসব কারখানা গড়ে তুলেছেন। প্রতি মাসে তাদের মাসোহারা দিয়ে থাকেন। তিনি জানান, কখনও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলে সে খবর তারা আগেই পেয়ে যান। তখন গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম তারা সরিয়ে নেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত কারখানা ভেঙে দিলে দু-তিন দিন পর ফের ভাট্টি গড়ে তোলে তাদের মাধ্যমেই ফের সংযোগ দেওয়া হয়।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এএইচএম রাসেদ বলেন, আবাসিক এলাকায় চুনা ও ঢালাই কারখানা পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় না।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স নারায়ণগঞ্জের উপসহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল আরেফীন বলেন, আবাসিক এলাকায় এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলো ফায়ার লাইসেন্স ছাড়া অবৈধভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে।
জানা যায়, উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের আষাঢ়িয়ার চর এলাকায় ও সোনারগাঁ পৌরসভার দত্তপাড়া এলাকায় সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মিজ সুহা তাবিল ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ২টি অবৈধ কারখানার ৫ টি ভাট্টি গুড়িয়ে দেয়। কিন্তু ঈদের ছুটির সুযোগে সবগুলো কারখানা পুরোদমে চুন উৎপাদন শুরু করেছে।
তিতাস গ্যাসের সোনারগাঁ অঞ্চলের ডিজিএম মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘নিয়মিত অভিযান চালিয়ে হয়রান হচ্ছি, সংযোগ বিচ্ছিন্ন, এক্সাভেটর দিয়ে গুড়িয়ে দিচ্ছি, মালামাল জব্দ করা ও মামলা দায়ের করা হলেও পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না এসব অবৈধ কারখানা। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অব্যাহত থাকবে বরে জানান তিনি।


আপনার মতামত জানান