প্রত্নসম্পদ কি বাণিজ্যিক শুটিংয়ের লোকেশন? – শাহেদ কায়েস

প্রকাশিত

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বিশ্বাস করতেন, শেকড়বিহীন কোনো জাতি টিকে থাকতে পারে না। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি লোকজ ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণের কেন্দ্র হিসেবে ঐতিহাসিক সোনারগাঁওকে বেছে নিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে বহুজাতিক কোমল পানীয় কোম্পানির ব্র্যান্ডিং ও বিজ্ঞাপন প্রদর্শন প্রতিষ্ঠানের সাংস্কৃতিক চরিত্রের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন জাতির ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না-তা ছড়িয়ে থাকে প্রাচীন নগর, মসজিদ, মন্দির, দুর্গ, প্রাসাদ ও প্রত্নস্থাপনার হাট-পাথরের শরীরে। এগুলো বর্তমান প্রজন্মের সম্পদ যেমন, তেমনি তবিযাৎ প্রজন্মের কাছেও আমাদের অর্পিত এক অমূল্য জামানত। তাই প্রত্নসম্পদের ক্ষেত্রে সংরক্ষণই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব, বাণিজ্যিক ব্যবহার নয়।

সম্প্রতি-সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের (সোনারগাঁও জাদুঘর) ঐতিহাসিক ‘বড় সরদার বাড়ি’ চার দিনের জন্য একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়। সেখানে ‘কোক স্টুডিও বাংলা সিজন ৪’-এর গানের ভিডিও ধারণ ও বিজ্ঞাপন। তৈরি উপলক্ষ্যে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর, আলোকসজ্জা, ভারী ক্যামেরা, সাউন্ড সিস্টেম এবং বিপুলসংখ্যক (প্রায় ২০০) কলাকুশলী নিয়ে ব্যাপক আয়োজন করা হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাকে-যার মূল ভবনটি প্রায় ৬০০ বছরের প্রাচীন, কীভাবে বাণিজ্যিক শুটিংয়ের জন্য ব্যবহার করা যায়? যদি যায়, তবে তার সীমারেখা কোথায়? আর সেই অনুমতি দেওয়ার আইনগত ক্ষমতাই-বা কার?

প্রত্নতত্ত্ববিদ ও স্থাপত্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, শত শত বছরের পুরোনো স্থাপনাগুলো বাইরে থেকে দৃঢ়মনে হলেও ভেতরের চুনসুড়কি, পোড়ামাটির ইট, কাঠ, প্লাস্টার ও অলংকরণ অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘ সময় শক্তিশালী স্টুডিও লাইট ব্যবহারে তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে তাপীয় প্রসারণ ও সংকোচনের ফলে সূদ্ধ ফাটল সৃষ্টি হতে পারে। ভারী লাইট স্ট্যান্ড, ক্যামেরা জেন, জেনারেটর, ট্রলি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির ওজন এবং কম্পন পুরোনো মেঝে, সিঁড়ি ও দেওয়ালের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে ক্ল্যাম্প, আঠা বা বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপনের কারণেও স্থাপত্যের পৃষ্ঠতল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসব ক্ষতি অনেক সময় তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু কয়েক বছর পর তার প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঐতিহাসিক স্থাপনায় শুটিংয়ের আগে বাধ্যতামূলকভাবে ‘হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট আংসেসমেন্ট করা হয়। সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ, স্থপতি ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতামতের ভিত্তিতে ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয় এবং কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়। শুটিংয়ের আগে ও পরে জনবনের প্রতিটি অংশের কারিগরি অবস্থা নথিভুক্ত করা হয়। কোনো ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে তার পুনঃসংরক্ষণের ব্যয় বহন করতে হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বড় সরদারবাড়ির ক্ষেত্রেও কি এমন কোনো মূল্যায়ন করা হয়েছিল। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞরা কি ভবনের ঝুঁকি নিরূপণ করেছিলেন? শুটিং শেষে কি কোনো স্বাধীন কারিগরি পরিদর্শন হয়েছে? যদি হয়ে থাকে, সেই প্রতিবেদন কোথায়? এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে না থাকায় জনমনে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের ‘প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ সংরক্ষণ আইন, ১৯৬৮’ অনুযায়ী সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদের সারক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কোনো কর্মকাণ্ড যদি প্রত্নস্থাপনার অখণ্ডতা, নিরাপত্তা বা ঐতিহাসিক বৈশিষ্টাকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে, তাহলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মতামত ও অনুমোদন অপরিহার্য। অর্থাৎ প্রশাসনিক সুবিধা বা আর্থিক লাভের ভিত্তিতে কোনো সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আইন দেয় না। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন দেশের একমাত্র জাতীয় লোকজ জাদুঘর ‘সোনারগাঁও জাদুঘর’-এর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। এটি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিচালিত হয়। তাহলে বড় সরদারবাড়ি ডার দিনের জন্য ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি কি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে করা হয়েছে? মন্ত্রণালয় কি এ বিষয়ে অবগত ছিল? যদি থেকে থাকে, তবে কোন আইনগত ভিত্তিতে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে? আর যদি মন্ত্রণালয় অবগত না থাকে, তাহলে সেটিও একটি গুরুতর প্রশাসনিক প্রশ্ন।

একইভাবে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ক্ষমতার সীমাও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। জাদুঘর পরিচালনার দায়িত্ব পালন করা আর একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাকে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া এক বিষয় নয়। যদি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পূর্ণাঙ্গ কারিগরি মতামত, সংরক্ষন পরিকল্পনা এবং আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। আর যদি সব ধরনের অনুমোদন যথাযথভাবে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট নথি, শর্তাবলি এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। জনসম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার বিকল্প নেই।

আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ নীতিমালাও এ বিষয়ে স্পষ্ট। ‘ডেনিস ডাটার (১৯৬৪)’ বলছে, ঐতিহাসিক স্থাপনার ব্যবহার এমন হতে হবে, যাতে তার ঐতিহাসিক চরিত্র, স্থাপত্যগত অখণ্ডতা এবং সাংস্কৃতিক মূল্য ক্ষুন্ন না হয়।

কোম্পানির ব্র্যান্ডিং ও বিজ্ঞাপন প্রদর্শন প্রতিষ্ঠানের সাংস্কৃতিক চরিত্রের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা তেবে দেখা প্রয়োজন। জাতীয় লোকজ জাদুঘর এমন একটি স্থান, যেখানে বাণিজ্যিক প্রচারণার চেয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস, লোকশিল্প ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মর্যাদাই সর্বাগ্রে প্রতিফলিভহওয়া উচিত।

এই ঘটনার পর পরিস্থিতি মোকাবিলায়। কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। শুটিংয়ের অনুমোদন, চুক্তি এবং শর্তাবলি প্রকাশ করতে হবে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে স্বাধীন আইকোমোস-এর বিভিন্ন সংরক্ষণ নির্দেশিকা একই নীতির ওপর জোর দেয়। ‘ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কনভেনশন, ১৯৭২ রাষ্ট্রগুলোকে ঐতিহ্য সংরক্ষণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানায়। বড় সরদারবাড়ি বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাযুক্ত না হলেও আন্তর্জাতিক সংরক্ষণনীতির মৌলিক নীতিগুলো অবশ্যই প্রাসঙ্গিক।

এই ঘটনার আরেকটি দিক হলো জনগণের অধিকার। চার দিন ধরে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা অসংখ্য দর্শনার্থী বড় সরদারবাড়ি দেখতে পারেননি। অভিযোগ রয়েছে, আগে থেকে কোনো ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয়নি। একটি সরকারি জাদুঘর জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়। তাই জনগণের প্রবেশাধিকার গীমিত করার সিদ্ধান্ত হলে তার যথেষ্ট কারণ, স্বচ্ছতা এবং পূর্বঘোষণা থাকা উচিত।

এখানে আরো একটি নৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে। বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেশের লোকজ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কারুশিল্প ও কারুশিল্পীদের সংরক্ষণ, গবেষণ, বিকাশ ও বিশ্বপরিচিতির উদ্দেশ্যে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন বিশ্বাস করতেন, শেকড়বিহীন কোনো জাতি টিকে থাকতে পারে না। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি লোকজ ঐতিহ্যের পুনর্জাগরণের কেন্দ্র হিসেবে ঐতিহাসিক সোনারগাঁওকে বেছে নিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে বহুজাতিক কোমল পানীয়।

কারিগরি পরিদর্শন করে ভবনের কোথাও দৃশ্যমান বা অদৃশ্য ক্ষতি হয়েছে কি না, তা জানাতে হবে। সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদে যে কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রমের আগে বাধ্যতামূলকভাবে ‘মেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ চালুর নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্নস্থল সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলে অন্তত এক সপ্তাহ আগে তা সোনারগাঁও জাদুঘরের ওয়েবসাইটে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গণমাধ্যমে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত।

সোনারগাঁ শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়-এটি প্রাচীন বাংলার রাজধানী, আমাদের রাষ্ট্রগঠন, বাণিজ্য, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম ভিত্তি। ‘বড় সরদারবাড়ি’ সেই ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কয়েক দিনের একটি বাণিজ্যিক শুটিং শেষ হয়ে যাবে, ভিডিওটিও একসময় বিস্মৃত হবে। কিন্তু এই প্রত্নস্থাপনার সামান্য ক্ষতিও যদি স্থায়ী হয়ে যায়, তার ক্ষতিপূরণ কোনো অর্থ দিয়ে সম্ভব নয়। প্রত্নসম্পদ থেকে আয় করা সহজ, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য আর কখনো ফিরে আসে না। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন, আমরা কি আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে সংরক্ষণ করব, নাকি ধীরে ধীরে তাকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের সাধারণ লোকেশনে পরিণত হতে দেব? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বড় সরদারবাড়ির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; এটি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতি রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়বদ্ধতার মানদণ্ডও

লেখক: সাহিত্যিক, অ্যাকটিভিস্ট

তথ্যসুত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

আপনার মতামত জানান