ড্রেজিংয়ের নামে লুটপাট, অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে

প্রকাশিত

 

গাজী মোবারক:

নদী রক্ষার জন্য যে ড্রেজিং, সেই ড্রেজিংই এখন নদীভাঙনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মেঘনার তীরে শতবর্ষী আনন্দবাজার হাটের পাশে বৈধ ড্রেজিং প্রকল্পের আড়ালে যে অবৈধ বালু উত্তোলন চলছে, তা কেবল আইনের লঙ্ঘন নয়, এটি একটি জনপদের ইতিহাস ও জীবিকাকে নদীগর্ভে ঠেলে দেওয়ার শামিল।

দিনের আলোয় নদী বন্দরের নিয়ম মেনে কাটিং ড্রেজার চলে, আর রাতের আঁধার নামতেই শুরু হয় লুটপাট। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট এই অপকর্মের হোতা। নদীর তীর ঘেঁষে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে মাটির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। যে হাটকে ঘিরে হাজারো মানুষের রুটিরুজি, যে হাট এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক ও সামাজিক ইতিহাসের সাক্ষী, সেই হাটই আজ বিলীনের মুখে।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সারা দেশেই ‘উন্নয়ন প্রকল্প’-এর নামে নদী থেকে অবৈধ বালু তোলা এখন একটি সংগঠিত অপরাধ। অথচ সরকারের নির্দেশনা স্পষ্ট। গত ১৪ মে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে: সূর্যাস্তের পর বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ, ইজারার শর্ত ভঙ্গ হলে শ্রমিক নয়, ইজারাদারকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। প্রশ্ন হলো, মাঠপর্যায়ে এই নির্দেশনার প্রয়োগ কোথায়?

আনন্দবাজারের ঘটনা প্রশাসনের দায়িত্বহীনতারও নজির। স্থানীয়রা যখন ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে, তখন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ফোনও রিসিভ হয় না। জনগণ যদি নিজেরাই রাত জেগে বালুদস্যু প্রতিহত করতে নামে, তবে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা কী?

এ ব্যাপারে আমাদের দাবি স্পষ্ট:

১. অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত:

আনন্দবাজারে কার ইন্ধনে রাতে বালু তোলা হচ্ছে, সেই সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয় যেন ঢাল না হয়।

২. প্রশাসনিক জবাবদিহি:

সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। রাতের বেলায় নিয়মিত নদীপথে টহল নিশ্চিত করতে হবে।

৩. নদী ও হাট রক্ষায় স্থায়ী পদক্ষেপ:

শুধু অভিযান নয়, আনন্দবাজার হাটের তীরে জরুরি ভিত্তিতে ব্লক বাঁধ দিয়ে ভাঙন ঠেকাতে হবে। হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ ছাড়া কোনো ইজারা নয়।

উন্নয়নের নামে ধ্বংস মেনে নেওয়া যায় না। ড্রেজিং হবে নদী বাঁচাতে, হাট বাঁচাতে, মানুষ বাঁচাতে। ড্রেজিংয়ের আড়ালে যদি লুটপাট চলে, তবে সেই ‘উন্নয়ন’ আমাদের দরকার নেই। আনন্দবাজার হাট কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়, এটি জনগণের। এই হাট রক্ষার দায় রাষ্ট্রের, প্রশাসনের, আমাদের সবার।

এখনই পদক্ষেপ না নিলে আগামী প্রজন্মকে আমরা একটি নদী, একটি হাট এবং একটি ইতিহাস হারানোর দায়ে অভিযুক্ত থাকব।

 

লেখক: সাংবাদিক

আপনার মতামত জানান