বিশেষ বিশ্লেষণ: ‘জনপ্রিয়তার শীর্ষে’

প্রকাশিত

বিশেষ বিশ্লেষণ:
‘জনপ্রিয়তার শীর্ষে’: বস্তুনিষ্ঠ তথ্য নাকি মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণা?

নির্বাচন ঘনিয়ে আসলেই গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিশেষ ধরনের খবরের জোয়ার দেখা যায়—“অমুক প্রার্থী জনপ্রিয়তার শীর্ষে”, “অমুক দলের সমর্থক জোয়ারে ভাসছে অমুক আসন” কিংবা “ভোটের আগেই জয় নিশ্চিতের পথে অমুক নেত্রী/নেতা”। বৈজ্ঞানিক বা সুনির্দিষ্ট কোনো মতামত জরিপ (Opinion Poll) ছাড়া, পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণের অভাব সত্ত্বেও গণমাধ্যমে প্রচারিত এমন চটকদার শিরোনাম পাঠক ও দর্শকদের মনে গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়: এটি কি বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, নাকি নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও মনস্তাত্ত্বিক মনোপলি তৈরি?
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপ্রতিনিধিত্ব ও নির্বাচনভিত্তিক সাংবাদিকতায় এ ধরনের ঢালাও ও প্রমাণহীন দাবি উপস্থাপন করা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী।
কেন এটি পেশাদার সাংবাদিকতার পরিপন্থী?
প্রথম কারন, প্রমাণ ও জরিপহীন অনুমান নির্ভরতা:
আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীর জনপ্রিয়তার হিসাব দিতে হলে কঠোর ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি মেনে চালানো জরিপের উপাত্ত (Data) উপস্থাপন করা বাধ্যতামূলক। নমুনা আকার (Sample size), মার্জিন অব এরর (Margin of Error) ও জরিপের পদ্ধতি না জানিয়ে কেবল লোকমুখে শোনা কথা বা আংশিক দৃশ্যের ওপর ভিত্তি করে কাউকে ‘জনপ্রিয়তার শীর্ষে’ ঘোষণা করা স্রেফ অনুমানভিত্তিক মন্তব্য, যা সংবাদের চরিত্র বহন করে না।
দ্বিতীয় কারন, জনমত প্রভাবিত করার অপচেষ্টা (Bandwagon Effect): নির্বাচনী মনস্তত্ত্বে ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’ একটি পরিচিত ধারণা। অনেক সময় সাধারণ ভোটাররা নিশ্চিত বিজয়ী প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেওয়ার প্রবণতা দেখান। ভোটের আগেই কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর জয় বা জনপ্রিয়তার প্রচার চালিয়ে ভোটারদের মানসিকতাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়, যা নিরপেক্ষ নির্বাচন ও স্বাধীন মতামত প্রকাশের পরিবেশ ব্যাহত করে।
তৃতীয়ত, হলুদ সাংবাদিকতা ও স্পন্সরড কনটেন্ট:
অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনী স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব বা অর্থনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে ইতিবাচক ইমেজ তৈরির জন্য বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের ছদ্মবেশে পিআর (Public Relations) কনটেন্ট প্রচার করা হয়। পেশাদারিত্বের ভাষায় এটি সংবাদের নামে রাজনৈতিক বিপণন বা একধরনের চটকদার প্রচারমাধ্যম চর্চা।
চতুর্থ কারন, প্রতিপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ব্যাকফুটে ঠেলে দেওয়া: নির্বাচনের আগেই কোনো এক পক্ষকে এককভাবে জনপ্রিয় বা বিজয়ী হিসেবে তুলে ধরা হলে প্রতিপক্ষ দল ও প্রার্থীর সমর্থকরা হতাশায় ভুগতে পারে। এতে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহও কমে যেতে পারে।
✅ মূলধারার সাংবাদিকতার নৈতিক দায়িত্ব
নির্বাচন কমিশনের নীতিমালা এবং বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যম নীতিশাস্ত্রে সংবাদকর্মীদের জন্য কড়া দিকনির্দেশনা রয়েছে:
1️⃣ পক্ষপাতহীন উপস্থাপন:
নির্বাচনের সময় গণমাধ্যমের মূল কাজ মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র, ভোটারদের প্রত্যাশা, প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি ও তাঁদের অতীত কর্মকাণ্ডের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করা—কাউকে আগাম জয়ী করা নয়।
2️⃣ তথ্য বনাম মতামতের পার্থক্য রক্ষা:
সংবাদের শিরোনাম ও মূল অংশে নিরপেক্ষ তথ্য থাকা আবশ্যক। ব্যক্তিগত মতাদর্শ বা রাজনৈতিক আনুগত্যকে ‘সংবাদ’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া বিভ্রান্তিকর।
3️⃣ উপাত্তভিত্তিক সংবাদ চর্চা:
জরিপ পরিচালনা করতে হলে তার বৈজ্ঞানিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করে তবেই ফলাফল সংবাদের স্থান পাওয়া উচিত।

শেষ কথা হলো, ভোটের দিন গণনা শেষ হওয়ার আগে এবং জনগণের প্রত্যক্ষ রায় পাওয়ার আগে গণমাধ্যম কোনোভাবেই কাউকে ‘জনপ্রিয়তার শীর্ষে’ বলে রায় দিতে পারে না। এ ধরনের সংবাদ পরিবেশন পেশাদার সাংবাদিকতার সুনাম ক্ষুণ্ন করে এবং পাঠকের আস্থা নষ্ট করে।

একটি দায়িত্বশীল ও স্বাধীন গণমাধ্যমের কাজ হলো নিরপেক্ষ তথ্য তুলে ধরে পাঠককে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া; পাঠকের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত বা রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা চাপিয়ে দেওয়া নয়। নির্বাচনের মৌসুমে গণমাধ্যমকে তথ্যভিত্তিক, যাচাইকৃত ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশনে আরও বেশি সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা জরুরি।

গাজী মোবারক

আপনার মতামত জানান