মানবাধিকার সংগঠনের নামে প্রতারণার জাল
ওয়াকিল আহমেদ হিরন
রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় পরিবার নিয়ে থাকেন ফরহাদ আলী। ওষুধের দোকান চালান তিনি। পাশাপাশি ‘অপরাধ দমনে মানবাধিকার সংস্থা’ নামে একটি সংগঠনের সহকারী পরিচালক হিসেবে আইডি কার্ড নিয়েছেন গত বছর।
সিরাজগঞ্জের বেলকুচি এলাকার ফরহাদ জানান, কিছু টাকার বিনিময়ে তাঁর এক বড় ভাই মানবাধিকার সংগঠনের কার্ড করিয়ে দিয়েছেন। কোথাও কোনো ঝামেলায় পড়লে কার্ড বের করে দেখান। আবার মাঝেমধ্যে সালিশ-দরবারেও যান। দু’পক্ষের আপস-মীমাংসা হলে কিছু টাকা পাওয়া যায়। এ ছাড়া পাওনা টাকা আদায় করলে মোটা অঙ্কের কমিশন পাওয়া যায়। এই সংগঠনের নামে আরও ১০-১২ জন বিভিন্ন পদবি দিয়ে কার্ড ব্যবহার করছেন।
রাজধানীতে ফরহাদের মতো অনেক যুবক মানবাধিকার সংঠনের নামে কার্ড ব্যবহার করছেন। মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নানা কৌশলে হাতিয়ে নিচ্ছেন অর্থ। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এভাবেই ‘বিক্রি হচ্ছে’ মানবাধিকার। চাঁদাবাজি চলছে ভুয়া ও অখ্যাত সংগঠনের নামে। এগুলোর নেই সরকারি অনুমোদন। অনেক অপরাধীও মানবাধিকার কর্মী বনে গেছে। এ ছাড়া নিবন্ধিত অনেক সংগঠনের নামেও প্রতারণা চলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীতে ২৮টি এবং সারাদেশে ৩০৫টি সরকার নিবন্ধিত মানবাধিকার সংগঠন আছে। যাদের অধিকাংশই মানবাধিকার রক্ষার কথা বলে প্রতারণামূলক কাজ করছে। এর বাইরে ঢাকাতেই ‘ভুয়া’ সংগঠন ৫২ থেকে ৫৫টি বলে জানা গেছে। পাড়া-মহল্লায় রয়েছে এদের জাল। ঢাকার বাইরেও রয়েছে শাখা-প্রশাখা।
রাষ্ট্রীয় সংস্থা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে ভুয়া সংগঠনের নামে প্রতারণার অনেক অভিযোগ এসেছে। কমিশনের কারওয়ান বাজার অফিসে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশন, বাংলাদেশ মানবাধিকার কাউন্সিল (বামকা), আইন সহায়তা কেন্দ্র ফাউন্ডেশন (বাসক), হিউম্যান রাইটস রিভিউ সোসাইটি, বাংলাদেশ মানবাধিকার ও উন্নয়ন কমিশন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত সংস্থা, আইন সহায়তা ফাউন্ডেশন (আসফ), আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দুর্নীতিবিরোধী সোসাইটি, অপরাধ দমন মানবাধিকার সংস্থা, মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কমিশনের নামে অভিযোগ এসেছে। এ ছাড়া সার্চ মানবাধিকার সোসাইটি বাংলাদেশ, সার্ক মানবাধিকার সোসাইটি, হিউম্যান রাইটস আই, ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস ফেডারেশন, হিউম্যান রাইট অ্যান্ড পিস সোসাইটিসহ আরও বেশ কয়েকটি অনিবন্ধিত সংগঠন রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামালউদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, মানবাধিকার কমিশনের নামে গ্রামগঞ্জেও ভুয়া সংগঠন ছড়িয়ে পড়েছে। সালিশের মাধ্যমে আপস-মীমাংসার নামে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাড়া-মহল্লায় কমিটি গঠনের নামে বিভিন্ন পদ দেওয়া ও আইডি কার্ড বাণিজ্যের অভিযোগও আছে। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে পদক বিক্রিরও অভিযোগ পাওয়া যায়। মুখোশধারী প্রতারকদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
সমাজসেবা অধিদপ্তর, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর কাছে মানবাধিকার সংগঠনের নামে নিবন্ধনের তালিকা চাওয়া হয়েছে। তালিকা পেলেই যাচাই করে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক মানবাধিকার কর্মী সমকালকে জানিয়েছেন, কতিপয় ভুয়া সংগঠনের লোকজন সেবাপ্রার্থীদের ভুল বুঝিয়ে মানবাধিকারের নামে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। পারিবারিক, জমিসংক্রান্তসহ যে কোনো সমস্যা সমাধানের নামে অর্থ আদায় করে তারা। প্রশাসনের কাছে বিভিন্ন তদবিরের পাশাপাশি করছে আইডি কার্ড বাণিজ্য। সংগঠনের মনোগ্রাম ও পতাকা ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে কেউ কেউ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশসহ সরকারের মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের সরকারি প্রতিষ্ঠান ভেবে বিভ্রান্ত হন।
ঢাকা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক রোকনুল হক সমকালকে বলেন, ‘বর্তমানে মানবাধিকার সংগঠনের সরকারি রেজিস্ট্রেশন পাওয়া কঠিন, তার চেয়ে বেশি কঠিন নিবন্ধন বাতিল করা। আমাদের কাছে অভিযোগ এলে তদন্ত করা হয়। বেআইনি কার্যক্রম প্রমাণিত হলে নিবন্ধন বাতিল করা হয়।’ তিনি জানান, তাদের কাছে কয়েকটি সংগঠনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ এসেছে। এগুলোর তদন্ত চলছে।
জানা গেছে, সমাজসেবা অধিদপ্তর, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর কাছ থেকে নিবন্ধন নেওয়ার সময় শর্ত থাকে– স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বিনা ফিতে মানুষের কল্যাণে সেবা করা। কিন্তু নিবন্ধন নিয়ে অনেকে কাজ করছে তার উল্টো। এদিকে অভিযোগ আছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সঠিকভাবে তথ্য যাচাই না করে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন দিচ্ছে।
ঢাকায় ‘বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন’ নামে একটি সংগঠন আছে। এর মালিক সাইফুল ইসলাম দিলদার। বিদেশে লোক পাঠানোর নামে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ ও একাধিক বেআইনি কার্যক্রমের অভিযোগে এই সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হয়। তাকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অফিসও বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার। কিন্তু আবার ওই সংগঠনের কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ড. কামালউদ্দিন সমকালকে বলেন, ‘সাইফুল ইসলাম দিলদার বড় ধরনের প্রতারক ও চাঁদাবাজ। তার সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন ও বৈধ কাগজপত্র নেই। ১৫-২০ জন মিলে এটা চালায়। সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়। জেল খাটার পরও সে ভালো হয়নি। শুনেছি, তিনবার পরীক্ষা দিয়ে এসএসসি পাস করেছে।’
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে মানবাধিকারবিষয়ক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার নামে কোনো কোনো সংগঠন তাদের প্যাডে ভিসার জন্য সুপারিশ করে। বিভিন্ন দূতাবাস কর্তৃপক্ষ তাদের ভিসাও দেয়। কিন্তু বিদেশে গিয়ে তারা আর ফিরে আসে না। এভাবেই মানবাধিকার সম্মেলনের নামে ইউরোপ-আমেরিকায় হচ্ছে মানব পাচার।
এ প্রসঙ্গে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ সমকালকে বলেন, কিছু অনিবন্ধিত বা ভুয়া সংগঠনের নেতাদের চাঁদাবাজি ও সালিশের নাম করে বিভিন্ন কার্যকলাপের কারণে সম্মানহানি হচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্টদের উচিত নিয়মিত মনিটর করা এবং অবৈধদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দেশে ১৯৭৯ সালের দিকে হাতেগোনা কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের কার্যক্রম ছিল। পর্যায়ক্রমে এর পরিধি বাড়তে থাকে। এক সময় কিছু টাকা দিয়ে যে কেউ মানবাধিকার সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন বের করে নিত। ২০১১ সালে আইন পাসের পর গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন ছাড়া রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয় না। ২০০০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ভুয়া সংগঠনের নামে বিদেশ থেকে টাকা আসত। অভিযোগ আছে, জঙ্গিবাদের উত্থানে এই অর্থ ব্যবহার হতো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০৯ সালের আগে যেসব মানবাধিকার সংগঠনের গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন ছাড়া নিবন্ধিত হয়েছে, সেগুলো নবায়ন করার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন নেওয়ার নিয়ম বাধ্যতামূলক করা উচিত। তা না হলে প্রতারণা বন্ধ করা যাবে না।
এদিকে, জনস্বার্থে করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ২১ জুন হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় সংগঠন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ছাড়া কোনো বেসরকারি সংস্থা তাদের নামের শেষে ‘কমিশন’ শব্দ ব্যবহার করতে পারবে না। উচ্চ আদালতের এই রায়ের পরও ‘কমিশন’ শব্দ ব্যবহার থামছে না।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, প্রত্যেক জেলা প্রশাসকের কাছে হাইকোর্টের রায়ের কপি পাঠানো হয়েছে। কোনো এনজিও যদি এমন পরিচয় দেয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে গত ১৪ নভেম্বর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে বৈঠক হয়েছে। ড. কামালউদ্দিনের সভাপতিত্বে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠনের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে বৈঠকে বলা হয়, যারা মানবাধিকার নিয়ে কাজ করতে চায়, তাদের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন থেকে ছাড়পত্র (এনওসি) নেওয়ার বিধান করা উচিত।
সুত্র: সমকাল (প্রকাশ: ২০২৪)


আপনার মতামত জানান