একজন সাঈদুর রহমান রিমনের বিদায়, একযুগের অবসান

প্রকাশিত

আজিজুল ইসলাম যুবরাজ>>

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এমন কিছু মানুষের নাম লেখা আছে, যাদের অবদানকে কেবল পদ-পদবি, পুরস্কার কিংবা কর্মস্থলের তালিকা দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। তারা একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী নন; তারা নিজেরাই একটি প্রতিষ্ঠান। তারা কেবল সংবাদ পরিবেশন করেন না; তারা সময়কে লিপিবদ্ধ করেন, সমাজকে প্রশ্ন করেন, রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করান এবং মানুষের নীরব কান্নাকে জাতীয় আলোচনায় পরিণত করেন।

দেশবরেণ্য অনুসন্ধানী সাংবাদিক সাঈদুর রহমান রিমন ছিলেন তেমনই একজন।

তার নাম উচ্চারণ করলে শুধু একজন প্রতিবেদকের মুখ নয়, চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজন নিরলস সংবাদযোদ্ধার প্রতিচ্ছবি—যিনি জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো কাটিয়েছেন মানুষের গল্প খুঁজে বেড়াতে, সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে এবং অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাকে আলোর সামনে নিয়ে আসতে।

সাংবাদিকতা তার কাছে কখনো চাকরি ছিল না। ছিল না খ্যাতি অর্জনের সিঁড়ি কিংবা পদ-পদবির প্রতিযোগিতা। সাংবাদিকতা ছিল তার বিশ্বাস, তার দায়বদ্ধতা, তার নৈতিক অবস্থান এবং সর্বোপরি মানুষের প্রতি এক গভীর অঙ্গীকার।

আজকের সময়ে সংবাদ অনেক দ্রুত আসে, দ্রুতই হারিয়েও যায়। কিন্তু কিছু সংবাদ সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকে। কারণ সেই সংবাদে থাকে মানুষের জীবন, সমাজের বাস্তবতা এবং একজন সাংবাদিকের নির্ভীক বিবেক। সাঈদুর রহমান রিমনের লেখা বহু প্রতিবেদন সেই বিরল মর্যাদা অর্জন করেছে।

তিনি এমন এক প্রজন্মের সাংবাদিক, যারা সংবাদ সংগ্রহের জন্য শুধু কলম কিংবা ক্যামেরা নয়, নিজের জীবনকেও ঝুঁকির মুখে রাখতে দ্বিধা করতেন না। সীমান্ত, পাহাড়, অরণ্য, প্রত্যন্ত গ্রাম, আদালত, হাসপাতাল, সংসদ কিংবা অপরাধচক্রের আস্তানা—যেখানে সত্য লুকিয়ে ছিল, সেখানেই পৌঁছে গেছেন তিনি। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন সাংবাদিকের আসল পরিচয় ডেস্কে নয়, মাঠে।

১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার জাবরা পীরবাড়িতে জন্ম নেওয়া সাঈদুর রহমান রিমনের শৈশব কেটেছে সাহিত্য ও মননের আবহে। তার বাবা ইউনুস উদ্দিন আহমেদ ছিলেন সাহিত্যিক এবং সাংবাদিক। ফলে শব্দ, সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার বীজ রোপিত হয়েছিল পরিবার থেকেই। মা সাহারা আহমেদের স্নেহ, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশ তার ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ছাত্রজীবনেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন—তার পথ অন্যরকম। ১৯৮৫ সালে সাপ্তাহিক মুক্তিবাণী পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে শুরু হয় তার সাংবাদিকতা। তখন হয়তো তিনি নিজেও জানতেন না, এই ছোট্ট শুরু একদিন বাংলাদেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হবে।

এরপর দীর্ঘ পথচলা। দৈনিক ইত্তেফাক-এর সাভার সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন সাধারণ মানুষের জীবন, অন্যায়, বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। সেখানেই গড়ে ওঠে তার অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি। সংবাদ তার কাছে কেবল তথ্য নয়; বরং মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি।

পরবর্তী সময়ে তিনি একে একে দায়িত্ব পালন করেন দৈনিক আল-আমীন, বাংলাবাজার, মুক্তকণ্ঠ, মানবজমিন, সংবাদ, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, শেষে বাংলাদেশ প্রতিদিনের ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেলের প্রধানসহ দেশের বিভিন্ন শীর্ষ গণমাধ্যমে। কর্মজীবনের শেষ পর্বে দৈনিক দেশবাংলা-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক ঢাকা প্রতিদিন-এর উপদেষ্টা সম্পাদক এবং দৈনিক বাংলাভূমি-এর প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তবে পদ যত বড় হয়েছে, মানুষটি ততটাই বিনয়ী থেকেছেন। এটাই ছিল সাঈদুর রহমান রিমনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

তার সহকর্মীরা বলেন, তিনি সম্পাদক হওয়ার পরও নিজেকে রিপোর্টার বলতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। কারণ তার বিশ্বাস ছিল—সংবাদপত্রের প্রাণ ডেস্কে নয়, মাঠে; মানুষের ভিড়ে, জনপদের ধুলোয়, সীমান্তের অনিশ্চয়তায়, সেই সব অচেনা মুখের কাছে, যাদের কথা কেউ শোনে না।

সম্ভবত এই কারণেই তিনি ছিলেন আলাদা।

আজ যখন অধিকাংশ সাংবাদিক নির্দিষ্ট একটি বিটে কাজ করেন, তখন রিমন ছিলেন বহুমাত্রিক। রাজনীতি, অর্থনীতি, অপরাধ, বিচার, সংসদ, কূটনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, পরিবেশ, শেয়ারবাজার, নির্বাচন—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি কাজ করেছেন। এই বহুমাত্রিকতা তাকে শুধু একজন দক্ষ রিপোর্টার নয়, একজন পূর্ণাঙ্গ সংবাদকর্মীতে পরিণত করেছে।

কিন্তু তার আসল পরিচয় এখনো বলা হয়নি। তার সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি সত্যের কাছে কখনো আপস করেননি। ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার করেননি। ভয়কে কখনো পেশার অংশ বানাননি। সত্যের জন্য প্রয়োজন হলে তিনি পথ বদলেছেন, কর্মস্থল বদলেছেন, কিন্তু নীতি বদলাননি।

আর এখানেই সাঈদুর রহমান রিমন অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে ওঠেন। তিনি শুধু সংবাদ লেখেননি। তিনি সাংবাদিকতার বিবেককে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন।

 

মাঠই ছিল যার বিশ্ববিদ্যালয়

একজন সাংবাদিককে চেনার সবচেয়ে বড় উপায় তার কর্মস্থল নয়, তার কর্মক্ষেত্র। কেউ নিউজরুমে বড় হন, কেউ স্টুডিওতে। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাদের প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে মাঠ—মানুষের জীবন, কষ্ট, সংগ্রাম এবং বাস্তবতার অজস্র অনুচ্চারিত গল্প। সাঈদুর রহমান রিমনের সাংবাদিকতা ছিল সেই ধারার।

সত্যের সন্ধানে তিনি শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সাংবাদিকতায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে গেছেন তিনি। পাহাড়, সীমান্ত, চর, হাওর, সুন্দরবন, আদিবাসী অধ্যুষিত জনপদ, দুর্গম বনাঞ্চল কিংবা সংঘাতপ্রবণ এলাকা—যেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ গল্প লুকিয়ে আছে বলে বিশ্বাস করেছেন, সেখানেই পৌঁছে গেছেন নিজের ঝুঁকি নিয়ে।

এ কারণেই তার সাংবাদিকতা ছিল কাগজে-কলমে নয়; ছিল মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ।

দৈনিক ইত্তেফাক-এ কর্মরত অবস্থায় ধামরাই অঞ্চলের অপহরণ চক্র, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারের অভিযোগ এবং শিশু খাদ্যে তেজস্ক্রিয়তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে তার প্রতিবেদন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে তার অনুসন্ধান আরও পরিণত, আরও গভীর এবং আরও সাহসী হয়ে ওঠে।

দৈনিক বাংলাবাজার-এ দায়িত্ব পালন ছিল তার অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সুন্দরবন নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন, সীমান্ত পরিস্থিতি, জাসদ নেতা কাজী আরেফ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অনুসন্ধান এবং নরসিংদীতে বিষাক্ত মদপানে বহু মানুষের মৃত্যুর ঘটনার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তখন পাঠকমহলে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। এসব প্রতিবেদনের কারণে তিনি শুধু প্রশংসাই পাননি; মামলা, হুমকি এবং প্রতিশোধের মুখোমুখিও হয়েছেন।

একটি সংবাদ কখনো কখনো কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তা তিনি নিজের জীবন দিয়েই উপলব্ধি করেছিলেন।

তবে ভয় তাকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিটি বাধা যেন তাকে আরও দৃঢ় করেছে।

পরবর্তীতে দৈনিক সংবাদ-এ যোগ দেওয়ার পর তার সাংবাদিকতায় যেন নতুন এক দিগন্ত উন্মোচিত হয়। নিজেই একাধিকবার বলেছেন, সাংবাদিকতার সবচেয়ে পরিপূর্ণ সময় তিনি এই প্রতিষ্ঠানেই কাটিয়েছেন। এখানে তিনি শুধু সংবাদ লেখেননি; নিজেকে নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন।

গারো পাহাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, খাসিয়া সম্প্রদায়ের জীবনসংগ্রাম, সীমান্ত এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা, হালুয়াঘাট সীমান্তের নিরাপত্তা বাস্তবতা, দুর্গম অঞ্চলের মানুষের বঞ্চনা—এমন বহু বিষয় তিনি ধারাবাহিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে জাতীয় পরিসরে তুলে আনেন।

এগুলো ছিল কেবল প্রতিবেদন নয়; রাষ্ট্রের প্রান্তিক মানুষদের কণ্ঠস্বর।

সাংবাদিকতার প্রয়োজনে তিনি দেশের ৬০টিরও বেশি জেলা এবং শত শত উপজেলা সফর করেছেন। দুর্গম এলাকায় দিনের পর দিন অবস্থান করেছেন। কখনো পাহাড়ি পথে হেঁটেছেন, কখনো সীমান্তবর্তী অজানা জনপদে থেকেছেন, কখনো বনাঞ্চলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন।

আজকের দিনে ডিজিটাল প্রযুক্তি অনেক কাজ সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু রিমনের সাংবাদিকতা গড়ে উঠেছিল এমন এক সময়ে, যখন একটি তথ্য যাচাই করতে দিনের পর দিন মাঠে থাকতে হতো। একটি ছবি তুলতে কিংবা একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য সংগ্রহ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো।

সেই শ্রমসাধ্য সাংবাদিকতাই তাকে আলাদা করেছে।

তার লেখা বহু প্রতিবেদন প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কোথাও তদন্ত শুরু হয়েছে, কোথাও নীতিগত আলোচনা হয়েছে, কোথাও ভুক্তভোগী মানুষ রাষ্ট্রীয় সহায়তা পেয়েছেন। একজন সাংবাদিকের কলম যে সমাজে বাস্তব পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে, তার কর্মজীবন তারই প্রমাণ।

সাংবাদিকতা নিয়ে তার একটি দর্শন ছিল—ঘটনার পেছনের ঘটনা খুঁজে বের করা।

তিনি কখনো কেবল ঘটনাটি লিখে থেমে থাকতেন না। চেষ্টা করতেন কেন ঘটল, কারা দায়ী, এর সামাজিক প্রভাব কী, মানুষের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। এই কারণেই তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো সময়ের পরীক্ষায় টিকে আছে।

আপনার মতামত জানান