অবৈধ চুন কারখানা: সস্তার পেছনে চড়া মূল্য – গাজী মোবারক

প্রকাশিত

 

চুন ছাড়া নির্মাণ থমকে যায়, কৃষিজমির অম্লতা কমে না, মাছের ঘেরও বাঁচে না। অথচ এই অতি প্রয়োজনীয় উপাদানটির উৎপাদন প্রক্রিয়া আজ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের আনাচে-কানাচে, বিশেষ করে মেঘনা তীরবর্তী সোনারগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায়, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অবৈধ চুন কারখানা। পরিবেশ ছাড়পত্র নেই, আধুনিক চুল্লি নেই, শ্রমিকের নিরাপত্তা নেই—আছে শুধু মুনাফার নেশা।

সমস্যার গোড়া দুটি। এক, জ্বালানি। কাঠ, টায়ার, প্লাস্টিক পুড়িয়ে খোলা চুল্লিতে চুন পোড়ানো হয়। এতে একদিকে উজাড় হচ্ছে বন, অন্যদিকে বাতাসে মিশছে সালফার ডাই-অক্সাইড ও অতিসূক্ষ্ম ধূলিকণা। আশপাশের গ্রামে শ্বাসকষ্ট ও চোখের রোগ এখন সাধারণ ঘটনা। দুই, কাঁচামাল। পাহাড় কেটে বা নদী থেকে চুরি করা পাথরই এসব কারখানার প্রধান জোগান। ফলে পাহাড়ধস, নদীভাঙন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ত্বরান্বিত হচ্ছে।

অর্থনীতির হিসাবটাও কম ভয়াবহ নয়। অবৈধ কারখানা প্রতি বস্তা চুন ২০০-২৫০ টাকা কমে বিক্রি করে বাজার দখল করছে। ফলে বিএসটিআই অনুমোদিত, কর দেওয়া বৈধ কারখানা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব, শ্রমিক বঞ্চিত হচ্ছে ন্যায্য মজুরি ও নিরাপত্তা থেকে, আর কৃষক হারাচ্ছে উর্বর জমি। চুনের গুঁড়া পড়ে মাটির pH অস্বাভাবিক বেড়ে ধানের ফলন ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার নজির আছে।

প্রশাসন মাঝেমধ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে, জরিমানা হয়, কারখানা সিলগালা হয়। কিন্তু সপ্তাহ না ঘুরতেই আবার ধোঁয়া ওড়ে। কারণ শুধু আইন প্রয়োগে সমস্যার সমাধান নেই। চাহিদা আছে, অথচ বৈধ সরবরাহ কম ও দাম বেশি। এই শূন্যস্থানই পূরণ করছে অবৈধ কারখানা।

তাহলে পথ কী?

✅ প্রথমত,

প্রযুক্তিতে বাধ্যবাধকতা আনতে হবে। খোলা চুল্লি নিষিদ্ধ করে ভার্টিক্যাল শাফট কিলন বাধ্যতামূলক করা জরুরি। এতে জ্বালানি ৪০% সাশ্রয় হয়, ধোঁয়া কমে ৮০%।

✅ দ্বিতীয়ত,

স্থান নির্ধারণ। লোকালয়, কৃষিজমি ও জলাশয় থেকে ন্যূনতম এক কিলোমিটার দূরে নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চলেই কেবল চুন কারখানার অনুমতি থাকবে।

✅ তৃতীয়ত,

বাজার নিয়ন্ত্রণ। বিএসটিআই সিল ও ভ্যাট চালান ছাড়া কোনো ডিলার চুন বিক্রি করতে পারবে না। সড়কে চলাচলকারী চুনবাহী ট্রাকের কাগজপত্র নিয়মিত চেক করতে হবে।

✅ চতুর্থত,

প্রণোদনা। বৈধ উদ্যোক্তারা যাতে সহজ শর্তে ঋণ ও আধুনিক চুল্লি আমদানির সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই সস্তা ও টেকসই চুন বাজারে আসবে।

সবশেষে দরকার সামাজিক সচেতনতা। নির্মাতা, ঘের মালিক বা কৃষক যখন শুধু দাম দেখে চুন কেনেন, তখন তিনি নিজের অজান্তেই নিজের জমি, নদী ও সন্তানের ফুসফুসকে ঝুঁকিতে ফেলেন।

অবৈধ চুন কারখানা বন্ধ মানে উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া নয়। বরং উন্নয়নকে টেকসই করা। সস্তার পেছনে আমরা যে চড়া মূল্য দিচ্ছি, সেটা আরেকটি প্রজন্ম বইতে পারবে না। এখনই লাগাম টানার সময়।

আপনার মতামত জানান