সাংবাদিকের রাজনীতি বনাম রাজনীতির কবলে সাংবাদিক
খন্দকার মোজাম্মেল হক>>
জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বাধীন সাংবাদিকতার যে মূলমন্ত্র বস্তুনিষ্ঠতা, নির্ভীকতা এবং নিরপেক্ষতা- বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় তা আজ এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে।
সম্প্রতি শরীয়তপুরে সাংবাদিকদের ওপর বর্বরোচিত হামলা, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা এবং স্থানীয় প্রেসক্লাবের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা সাংবাদিকতার জগতের সেই ক্ষতটিকে আবারও উন্মুক্ত করে দিয়েছে, যা দীর্ঘকাল ধরে মনের গভীরে তীব্র দহন তৈরি করছিল। শরীয়তপুরে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সময় টিভির প্রতিনিধি এ বি এম ইসরাফিল, নিউজ ২৪-এর প্রতিনিধি বিধান মজুমদার অনি, দ্য ডেইলি স্টারের জাহিদ হাসান রনি এবং দৈনিক এদিনের শরীয়তপুর জেলা প্রতিনিধি মোহাম্মদ বরকত উল্লাহর সাথে ঘটে যাওয়া হামলা, ধারাবাহিক হেনস্তা ও আইনি হয়রানি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আসলে বর্তমান বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক নির্মম ও বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
সাংবাদিক নেতারা যখন সরাসরি রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ পদধারী হন, তখন সাধারণ সাংবাদিকদের সুরক্ষায় অবধারিতভাবেই সংকট তৈরি হয়। প্রশাসন, পুলিশ, প্রেসক্লাব এবং স্বয়ং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের অভাবে ক্ষমতার দাপটের কাছে মাঠপর্যায়ের সৎ সাংবাদিকরা আজ সম্পূর্ণ অসহায় ও অভিভাবকহীন।
এমনকি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা প্রায়ই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সমর্থক সরকারি কর্মকর্তাদের রোষানল, প্রকাশ্য হুমকি কিংবা নির্মম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। শরীয়তপুরের সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে যদি পুরো দেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যাবে ত্রিমুখী চাপ রাজনৈতিক প্রভাব, প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা এবং আমলাতান্ত্রিক আগ্রাসনের কারণেই সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
রক্ষক যখন ভক্ষক
শরীয়তপুরের ঘটনার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে ক্ষমতার তিনটি স্তর- স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং সাংবাদিক নেতৃত্ব একযোগে সাধারণ ও মাঠপর্যায়ের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে কোনো রকম পূর্ব নোটিশ বা বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই জেলা প্রশাসন কর্তৃক ঐতিহ্যবাহী শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সীমানা প্রাচীর ও তিনটি দেয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে প্রেসক্লাবের সদস্যরা জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ১৪ শতাংশ জমি লিজ নিয়ে এই জায়গাটির উন্নয়ন করেছিলেন। কিন্তু এরই মধ্যে হঠাৎ পার্ক সম্প্রসারণের নামে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমের দিনের আলো এড়িয়ে রাতের আঁধারে উচ্ছেদ অভিযান প্রথম ধাক্কাটি দেয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিস্ময় ও ক্ষোভের জায়গাটি তৈরি হয় তখন, যখন জেলা প্রশাসক দাবি করেন যে এই উচ্ছেদ চালানো হয়েছে খোদ প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেনের সম্মতিতে।
এখানেই মফস্বল সাংবাদিকতার আসল ট্র্যাজেডি স্পষ্ট । প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন একই সাথে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি। একজন সাংবাদিক নেতার যখন এমন দ্বৈত ও সাংঘর্ষিক পরিচয় থাকে, তখন তিনি আর সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষার অভিভাবক থাকেন না, বরং নিজের রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ফলে, প্রেসক্লাবের নির্বাহী কমিটির ৮০ শতাংশ সদস্যের তথাকথিত মৌখিক সম্মতি নিয়ে জেলা প্রশাসনের এই উচ্ছেদকে মেনে নেওয়া হয়, যা সাধারণ সাংবাদিকদের স্বার্থের পরিপন্থী।
মব-জাস্টিস ও প্রকাশ্য ফ্যাসিবাদের দোসর ট্যাগিং
এমন প্রশাসনিক অবিচারের বিরুদ্ধে যখন সময় টিভির প্রতিনিধি ও প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক এ বি এম ইসরাফিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার হন এবং প্রতিবাদী পোস্ট দেন, তখন ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ তকমা জুড়ে দিয়ে তার ওপর নেমে আসে শারীরিক নির্যাতন। প্রেসক্লাব চত্বরেই সেই ক্লাবের সভাপতি ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আবুল হোসেনের ছেলে পলাশ ও তার দলবল ইসরাফিলের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়। শুধু তাই নয়, নিজেদের প্রাণের প্রেসক্লাব উচ্ছেদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে জেলা প্রশাসন কার্যালয় চত্বরে হামলার শিকার হন সাংবাদিক জাহিদ হাসান, বিধান মজুমদার ও বরকত মোল্লা।
এই হামলার মূল অভিযুক্ত, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লা যখন প্রকাশ্যে গণমাধ্যমকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তোমরা লেখবা, আমরা তোমাগো পিডামু। আমাগো কাছে অনেক সাংবাদিকের তালিকা আছে, রেডি থাইক্কো।’ তখন তা আর কোনো সাধারণ অপরাধীর হুমকি থাকে না। এটি স্বাধীন মতপ্রকাশ ও মুক্ত গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধে রাজনৈতিক ক্ষমতার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর যে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন এ দেশের ছাত্র-জনতা ও সাধারণ মানুষ দেখছে, সেখানে মাঠপর্যায়ের এই ক্যাডারভিত্তিক মব-জাস্টিস এবং গণমাধ্যমের ওপর চড়াও হওয়ার সংস্কৃতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি ফ্যাসিবাদের পতনের পর যদি আরেকটি উগ্র ও সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্থান ঘটে, তাহলে রাষ্ট্রের মৌলিক গণতান্ত্রিক কাঠামো কখনোই দাঁড়াতে পারবে না। বিগত আওয়ামী আমলেও দেখা গেছে, প্রত্যন্ত উপজেলা প্রেসক্লাব থেকে শুরু করে জাতীয় প্রেসক্লাবের নেতা-নেত্রীরা সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সাথে জড়িত। দলীয় পদধারী এই নেতারা ভিন্নমতের সাংবাদিকদের যেমন কোণঠাসা করেছেন, একই সঙ্গে যখন ভিন্নমতের সাংবাদিকরা হামলা কিংবা জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন তখন তারা প্রতিবাদ না জানিয়ে বরং জুলুমে সঙ্গত দিয়ে গেছেন।
হামলা, পাল্টা মামলা ও আইনি হয়রানি
শরীয়তপুরে সাংবাদিকতায় নির্যাতনের দ্বিতীয় ধাপে যুক্ত হয় কাউন্টার ফ্যাসিবাদ, চাঁদাবাজি মামলা বা পাল্টা মামলার সংস্কৃতি। সাংবাদিক ইসরাফিল ও আক্রান্ত অন্য সাংবাদিকরা যখন থানায় অভিযোগ করতে যান, তখন পুলিশ তা নিতে গড়িমসি করে। অপরদিকে সাংবাদিকদের দমনে জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আরিফুজ্জামান মোল্লা, পরে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমান উল্লাহ আমানের করা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও মারপিটের অভিযোগ গ্রহণ করে পুলিশ। এটি একটি সুনির্দিষ্ট সিন্ডিকেটভিত্তিক কৌশল। যখনই কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার অপরাধ বা দাপটের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা আইনি পদক্ষেপ নেন, তখনই তাদের কণ্ঠ রোধ করতে পাল্টা চাঁদাবাজি বা মানহানির মামলা দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য একটাই, আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে সাংবাদিকদের মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত আপস বা মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করা।
সাংবাদিক নেতাদের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি
‘সাংবাদিকরা যখন রাজনৈতিক নেতা হয়, তখন সাধারণ সাংবাদিকরা মার খায়।’ এমন একটি বাক্য বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রূঢ় সত্য। কেউ কেউ ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ে সাংবাদিক নেতৃত্ব থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে অবস্থান করে। তখন পেশাগত অবক্ষয়ের চূড়ান্ত রূপকে নির্দেশ করে। স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রধান শর্ত হলো যেকোনো রাজনৈতিক দলের আদর্শ বা দলীয় এজেন্ডা থেকে নিজেকে দূরে রাখা। কিন্তু বাংলাদেশে জেলা-উপজেলার প্রেসক্লাবগুলো বহুদিন ধরেই সাংবাদিকতার চেয়ে স্থানীয় রাজনীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রেসক্লাবের শীর্ষ পদগুলো পেতে এখন মেধা বা পেশাদারির চেয়ে রাজনৈতিক লবিং ও দলীয় পরিচয় বরাবরই বেশি গুরুত্ব পায়।
যখন একজন সাংবাদিক নেতা একই সাথে বড় কোনো রাজনৈতিক দলের সহ-সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক হন, তখন তার প্রথম আনুগত্য থাকে দলের প্রতি, সাংবাদিকতার প্রতি নয়। ফলে দলের কোনো নেতা-কর্মী যখন সাধারণ সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়, তখন এই নেতারা নীরব ভূমিকা পালন করেন। তারা প্রশাসন বা পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করার পরিবর্তে উল্টো আক্রান্ত সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন মামলা তুলে নেওয়ার জন্য। শরীয়তপুরেও আমরা দেখছি, প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন রবিনও আক্রান্ত সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়িয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো কোনো উদ্যোগ নেননি। এই দলীয় লেজুড়বৃত্তি মফস্বলের সৎ ও নির্ভীক সাংবাদিকদের ভেতর থেকে একা ও নিঃসঙ্গ করে দিচ্ছে।
প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের উদাসীনতা এবং কর্পোরেট অবহেলা
কোনো সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ হওয়ার পরে অনেক ক্ষেত্রেই বলতে শোনা যায় আমরা আমাদের কর্মস্থল থেকে কোনো সাপোর্ট পাচ্ছি না। এটি বাংলাদেশের মিডিয়া হাউসগুলোর এক অন্ধকার দিক। ঢাকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে যেসব গণমাধ্যম মালিক ও নীতি-নির্ধারকরা বড় বড় বুলি আওড়ান, মফস্বলের প্রতিনিধিদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের অবদান প্রায় শূন্য। মফস্বলের একজন সাংবাদিককে প্রতিদিন অত্যন্ত সীমিত বেতনে, কিংবা অনেক ক্ষেত্রে বিনা বেতনে, কেবল লাইনেজ বা সংবাদের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে পাওয়া অংকের বিনিময়ে কাজ করতে হয়। তারা যখন স্থানীয় ভূমিদস্যু, দুর্নীতিবাজ আমলা বা রাজনৈতিক ক্যাডারদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেন, তখন মিডিয়া হাউসগুলো সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করে পাঠক, টিআরপি বা ভিউ বাড়ায়। কিন্তু সেই প্রতিবেদনের কারণে যখন ওই সাংবাদিক ও তার পরিবার স্থানীয়ভাবে অবরুদ্ধ ও আক্রান্ত হন, তখন কেন্দ্রীয় অফিস অনেক সময়ই দূরত্বের অজুহাতে বা রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে নিজেদের হাত গুটিয়ে নেয়।
শরীয়তপুরে আক্রান্ত এক সাংবাদিক তো আক্ষেপ করে বলেছেন, এই বিপদে নিজের প্রতিষ্ঠানকেই পাশে পাননি তিনি। এই প্রাতিষ্ঠানিক অভিভাবকহীনতা মফস্বল সাংবাদিকদের মানসিকভাবে আরো বেশি পঙ্গু করে দেয়। যখন একজন সাংবাদিক দেখেন যে আক্রান্ত হওয়ার পর তার নিজের প্রতিষ্ঠান, তার নিজের প্রেসক্লাব এবং স্থানীয় প্রশাসন কেউ তার পাশে নেই।
সুত্র : দৈনিক এদিন


আপনার মতামত জানান