লেপ তোষকের ব্যবসার আড়ালে বিপিসির পাইপ লাইন কেটে তেল চুরি

প্রকাশিত

মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের হাদিফকিরহাট এলাকায় দুই মাস আগে এক ব্যক্তি একটি জমি ভাড়া নেন। মালিককে জানান তিনি লেপ-তোশকের ব্যবসা করবেন। শীত আসন্ন থাকায় জমির মালিকও তাকে বিশ্বাস করলেন। লেপ-তোশকের দোকান দেওয়া হলো। ব্যবসা শুরু হলো। কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে ওই এলাকার মানুষের চোখ ছানাবড়া! লেপ-তোশকের দোকান থেকে অনবরত ডিজেল বের হচ্ছে। একপর্যায়ে সেগুলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। পাশের একটি পুকুর ডিজেলে ভরে গেল। যে যার মতো বালতি নিয়ে ডিজেল সংগ্রহ করতে শুরু করলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে দোকান ভাড়া নেওয়া ব্যক্তি পালিয়ে গেলেন। স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে প্রশাসন বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানায়।

মিরসরাইয়ের এই অংশের নিচ দিয়ে গেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চট্টগ্রাম-ঢাকার তেল সরবরাহের পাইপলাইন। মূলত এই পাইপলাইন থেকে তেল চুরির উদ্দেশে ওখানে জমি ভাড়া নিয়ে দোকান তৈরি করা হয়েছিল। এরপর পাইপলাইন ছিদ্র করে তেল বের করা হতো। এরপর সেগুলো ট্রাকের মাধ্যমে অন্য কোথাও নিয়ে যেত।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিপিসির চট্টগ্রাম-ঢাকা পাইপলাইনে তেল সরবরাহে কোনো বাধা কিংবা ছিদ্র হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিপিসির পাইপলাইন কর্তৃপক্ষ তথা পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন পিএলসির স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত পাওয়ার কথা। বিপিসির এই সহযোগী প্রতিষ্ঠান দেশের জ্বালানি তেলের পাইপলাইনগুলো পরিচালনা করে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে তারা কোনো সংকেত পায়নি। কেউ কেউ মনে করছেন, সংকেত পাওয়ার পরও তারা গোপন রেখেছেন।

জানা গেছে, দুই মাস আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের হাদিফকিরহাট এলাকার নুরুল আফসারের কাছ থেকে জমিটি ভাড়া নিয়ে আমিরুল নামে খুলনার এক ব্যক্তি একটি ঘর নির্মাণ করেন। এরপর পাশের আরেকটি ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে লেপ-তোশকের ব্যবসা শুরু করেন। মূলত এই ব্যবসার আড়ালে তিনি পাইপলাইন ছিদ্র করে ডিজেল চুরি করতেন। এরপর সেই ডিজেল ট্রাকে করে বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে বিক্রি করতেন। বৃহস্পতিবার সকালে একই পদ্ধতিতে চুরির সময় অতিরিক্ত ফ্লো থাকার কারণে তেলগুলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। লেপ-তোশকের ব্যবসায়ীরা তখন কৌশলে পালিয়ে যান। বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে তারা প্রশাসনকে খবর দেয়। স্থানীয় প্রশাসন বিপিসি এবং পদ্মা অয়েলকে বিষয়টি জানায়। সংস্থা দুটির কর্মীরা দুপুর ১২টার দিকে এসে পাইপলাইনের ছিদ্র বন্ধ করেন। এ সময় সেখান থেকে তেল চুরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

আমিরুল ইসলাম নামে ওই এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘লেপ-তোশকের ব্যবসার আড়ালে এখানে ডিজেল চুরি করা হতো। সকাল-রাত দুই বেলা ট্রাক ভর্তি করে ডিজেল নিয়ে যাওয়া হতো। এই অপকর্মের সঙ্গে কয়েকটি চক্র জড়িত। বৃহস্পতিবার সকালেও চক্রটি তেল চুরি করছিল। কিন্তু তেলের অতিরিক্ত ফ্লো থাকার কারণে সেগুলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। পাশের একটি পুকুর তেলে ভর্তি হয়ে যায়। স্থানীয়রা বালতিতে করে ডিজেল নিয়ে যায়।’

আশরাফ নামে স্থানীয় আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘ডিজেল চুরির ঘটনার সঙ্গে বিপিসির লোকদের জড়িত থাকার সম্ভাবনা আছে। একজন ব্যক্তির পক্ষে কখনো একা এই কাজ করা সম্ভব না। যখন পাইপলাইন ড্রিল (ছিদ্র) করেছে তখন তেলের সংস্পর্শে এসে বিস্ফোরণ হওয়ার কথা। কিন্তু তা হয়নি। অবশ্যই বিপিসির লোকজন ডিজেল চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত।’

ঘটনার পর মিরসরাই উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আলাউদ্দিন কাদের, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) দুই কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তবে তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

মিরসরাই থানার ওসি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জমির মালিকের স্বজন নুর জাহান বেগমকে আটক করা হয়েছে। তবে ডিজেল চুরির ঘটনায় বিপিসির পক্ষ থেকে এখনো থানায় কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি।’

বিপিসির পাইপলাইন প্রকল্পটি পরিচালনা করে পদ্মা অয়েল কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান জানান, পাইপলাইন ব্যবস্থাপনার কাজ করে পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি (পিটিসি)। তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। যদিও পিটিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রায়হান আহমাদের অফিসিয়াল নম্বরে কল করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ব্যক্তিগত মোবাইলে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।

 

আপনার মতামত জানান