শহীদ জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত মারিখালী নদে দখলদারের থাবা

প্রকাশিত
সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি:
আট কিলোমিটার দীর্ঘ মারিখালী নদটি দখলদারের থাবায় এখন অস্তিত্বসংকটে। নদটি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মেঘনা নদীর একটি শাখা। উপজেলার বৈদ্যের বাজার থেকে উৎপন্ন হয়ে এটি পশ্চিম দিকে মোগরাপাড়া হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়েছে। এ নদটি সুলতানি আমলে মেঘনা থেকে পানাম নগরে বাণিজ্যের প্রধান পথ ছিল। খরস্রোতা এই নদটি নাব্য সংকট পড়লে ১৯৭৯ তৎকালিন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিজ হাতে পুনঃখনন করেন। এতে উপজেলার চারটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৩৫ টি গ্রামের কৃষক ও সাধারন মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭৯ সালের দিকে এ নদ খননের জন্য সোনারগাঁয়ে এসেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি নিজে কোদাল হাতে শ্রমিকদের সঙ্গে মাটি কাটায় অংশ নেন। এ স্মৃতি এখনো এলাকাবাসীর মনে অম্লান। জিয়াউর রহমানের এই কীর্তি অমর করে রাখতে স্থানীয়রা এ নদের পাড়ে গড়ে ওঠা গ্রামের নাম রাখেন জিয়ানগর। গ্রামবাসীর দাবি, জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত এই খালটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনঃখনন ও দখল মুক্ত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য সামাদ মেম্বার জানান, খাল খননের সময় ইউপির মাহি চেয়ারম্যান ওই কর্মসূচির দায়িত্ব পালন করেন। শ্রমিকদের গম দেওয়ার বিনিময়ে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়। তিনি বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাহেব হেলিকপ্টার দিয়ে এখানে আসেন। তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কাটেন। এ সময় জিয়াউর রহমানের সাথে তিনি শ্রমিকদের মাথায় মাঠি তুলে দেওয়ার সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হিসেবে গর্ববোধ করেন। মাটি কাটা দেখতে শত শত মানুষ ভীর জমায়।
মাহি চেয়ারম্যানের ছেলে মিলন বলেন, এ খাল কাটার সময় প্রয়াত পিতা মাহি চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমানের সাথে থেকে খাল খননের দায়িত্ব পালন করেন। পরে এর নাম রাখা হয় “জয় জিয়া খাল।”
ভাটিবন্দ গ্রামের আবুল বাশার বলেন, জিয়াউর রহমান খাল খনন করে যেখানে মাটি ফেলেছেন সে জায়গার নাম করা হয়েছে জিয়ানগর। বর্তমানে জিয়ানগর গ্রামে কয়েক হাজার মানুষ বসবাস করে। এখানে জিয়ানগর জামে মসজিদ নামে একটি মসজিদও আছে। অথচ দখল ও দূষণে নদটি আজ আমাদের জন্য অভিশাপ। তাঁরা বর্তমানে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের কাছে খাল পুনঃখননের দাবি জানান।
জিয়া নগর গ্রামবাসীর অভিযোগ, প্রবেশমুখে একটি কারখানা নির্মাণের সময় খালের অংশ ভরাট করা হয়েছে। এতে কৃষকেরা ধান চাষ করতে পারছেন না। পাশাপাশি আশপাশের অন্তত ২০টি কারখানার বর্জ্য খালে পড়ছে। এ কারণে পানি দূষিত হয়ে কৃষিজমি ও ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষতি হচ্ছে। এই খাল কৃষি সেচের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা আরও জানান, ২০১৭ সালে হেরিটেজ পলিমার এন্ড ভেজিটেবলস লিমিটেড নামক একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান কৃষিজমি ও পাশ্ববর্তী মারিখালী নদসহ সরকারী দুটি হালট দখল করে শক্তিশালী কয়েকটি ড্রেজারে দিয়ে জোরপূর্বক বালু ভরাট করে। প্রশাসন ও স্থানীয়দের বাধা উপেক্ষা করে শহীদ জিয়ার স্মৃতি বিজড়িত এ নদের প্রবেশমুখের অধিকাংশ জায়গা ভরাট করে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নদী ভরাট না করতে ২০১৯ সালে একটি বিজ্ঞপ্তি টানিয়ে দেয় উপজেলা প্রশাসন। এই বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার ১ ঘন্টার মধ্যে তৎকালিন এসিল্যান্ড রুহুল আমিন রিমনকে বদলি করা হয়। পরে কম্পানীর হয়ে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন কম্পানীর পক্ষে মেঘনানদী ও মারিখালী নদ দখলের অন্যতম হোতা সাংবাদিক নামধারী এক নদী খেকো, তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নদটি দখল করে সীমানা প্রাচীর নির্মান করে।
সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সহ সাধারন সম্পাদক ও পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী শহীদ সরকার  বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপ্রতি জিয়াউর রহমান যখন হেলিকপ্টার দিয়ে ভাটিবন্দ বালুর মাঠে নামেন তখন আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। তিনি নিজে শ্রমিকদের সঙ্গে সেখানে মাটি কেটেছেন। শ্রমিকেরা উৎসাহ পেয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ভূমিদস্যুরা দখল করে নদটি বিলীন করে দিচ্ছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এ খালটি উদ্ধার, খনন ও দুষণমুক্ত করা জরুরি। তিনি জানান, প্রস্তাবিত “শহীদ জিয়া স্মৃতি পরিষদ” জিয়াউর রহমানের স্মৃতি অম্লান করে রাখতে প্রয়োজনে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবে।
বর্তমান মেম্বার আফজাল হোসেন বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণ ও সাধারণ মানুষের স্বার্থে খাল দখলমুক্ত করা জরুরি।
সোনারগাঁ পৌর বিএনপির সিনিয়র সহ সাধারন সম্পাদক সাদিকুর রহমান সেন্টু বলেন, আমার পিতা বশিরউদ্দিন মোল্লা (বসু মোল্লা) এ খাল খননের সময় জিয়াউর রহমানের সাথে ছিলেন। বর্তমান এ নদে কয়েকটি ইউনিয়নের ময়লা আবর্জনা ফেলে গতিপথ প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর শহীদ জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত এ খালটি দখল ও দূষণমুক্ত এবং খনন করে মরানদী তে প্রাণ ফিরিয়ে দিবেন এই প্রত্যাশা করি।
সামাজিক সংগঠন ঘাসফুল ফাউন্ডেশনের সাধারন সম্পাদক মোস্তাক আহম্মেদ বলেন, মারীখালী নদ শুধু একটি জলাধার নয়, এটি কৃষি, পরিবেশ ও ঐতিহাসিক স্মৃতির অংশ। যথাযথ পুনঃখনন, দখলমুক্তকরণ ও বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা হলে খালটি আবারও সেচ, মাছ চাষ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক মোশারফ হোসেন বলেন, সোনারগাঁয়ের খালগুলো কারখানা ও নাগরিক বর্জ্যের আধারে পরিণত হয়েছে। অপরিকল্পিত শিল্প কারখানার মূল্য দিচ্ছে কৃষক ও সাধারণ মানুষ। তলানি জমে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই শিল্পাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এই খালের পানি দিয়ে কৃষকেরা চাষাবাদ করতেন। খালটির সঙ্গে তাঁর শৈশব জড়িত। অথচ এখন শিল্পের বর্জ্য এসে খালটি নিঃশেষ করে দিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ খালটির এমন ‍দুর্দশা দুঃখজনক। জিয়াউর রহমানের স্মৃতি রক্ষার্থে খালটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খনন করা দরকার। কারখানাগুলোকে অবশ্যই ইটিপি ব্যবহারের আওতায় আনতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ -৩ আসনের বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান মুঠোফোনে দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘অবশ্যই আমি এই খালটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খননের  জন্য যা যা দরকার সব করব। সংশ্লিষ্ট অথরিটির সঙ্গে কথা বলব।  মানুষের প্রত্যাশার পাশাপাশি এটা আমার নিজেরও দায়িত্ব। এখানে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।’

আপনার মতামত জানান