সোনারগাঁয়ে সোনালি মুকুলে ভরে আছে লিচু বাগান
বসন্তের পূর্ণতা নিয়ে গাছে গাছে সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে লিচুর সোনালি মুকুল। মুকুলের ম ম গন্ধে ভেসে আসছে ঋতুরাজ বসন্তের জাগরণি সতেজ হাওয়া আর মৌমাছির গুণগুণ গান। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন এলাকায় গাছে মুকুল আসার সাথে সাথে চাষিরা গাছ পরিচর্যা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। পাতি, বোম্বাই ও চায়না-৩ জাতের এই মুকুলে ভালো ফলনের আশা করা হচ্ছে তবে খরা বা আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে মুকুল ঝরে পড়ার ঝুঁকিও থাকে।
লিচুর মুকুল যেন ঝরে না পড়ে- তাই গাছের গোড়া পরিষ্কার, সেচ ও সার দিয়ে কৃষি অফিস থেকে অনুমোদিত ভিটামিন জাতীয় ওষুধ- স্প্রে করে বাগান পরিচর্যা করছেন চাষিরা। বাগানীদের বাড়তি শ্রম আর পরিচর্যা অব্যাহত রাখলেই মিলবে বাম্পার ফলন। সোনারগাঁয়ে একটি পৌরসভা ও কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি লিচু গাছের শাখায় শোভা পাচ্ছে থোকা থোকা মুকুল। বসতবাড়ি, রাস্তা-ঘাট, বাগানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি লিচু গাছের সবুজ পাতার ফাঁকে প্রস্ফূটিত হয়ে উঠছে হলুদ আভায় সোনালী মুকুল।
এ সময় লিচু বাগানে পানি সেচ দিচ্ছেন বাগান মালিকরা। পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য স্প্রে করছেন তারা। তারা স্বপ্ন দেখছেন, এবার লিচু চাষে অধিক ফলন পাবেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী মাস থেকেই লিচু বাজারজাত করতে পারবেন, এমনটিই আশা বাগান চাষিদের। কিছুদিন পর ফুল থেকে লিচুর গুটি বের হবে। তখন কীটনাশকসহ বিভিন্ন ভিটামিন জাতীয় ওষুধ স্প্রে করতে হবে। সাধারণত ফাল্গুন মাসে মুকুল আসে এবং বৈশাখ মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে এই সুস্বাদু লিচু বাজারে আসা শুরু করে।
সারাদেশের মধ্যে সোনারগাঁয়ের পাতি ও কদমী লিচু সবার আগে বাজারে আসে। সোনারগাঁয়ের লিচু বেশ সুমিষ্ট, সুস্বাদু ও রসালো। রসে ভরপুর সোনারগাঁয়ের লিচুকে রসগোল্লা লিচুও বলে থাকেন অনেক। লিচু পাকতে শুরু করলে দেশের বিভিন্নস্থান থেকে পাইকার ও দর্শনার্থী আসতে শুরু করে। তখন বাগান আর বাগান থাকে না হয়ে ওঠে এলাকা পর্যটন এলাকা।
সোনারগাঁয়ে যেসব জায়গায় লিচু বাগান আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পৌরসভার আদমপুর, অর্জুন্দী, দুলালপুর, খাগুটিয়া, খাসনগর দীঘিরপাড়, চিলারবাগ, দৈলরবাগ, দরপত, টিপরদী, হরিশপুর, তাজপুর, গোবিন্দপুর, কৃষ্ণপুরা, বাগমুছা, পানাম, গোয়ালদী, ভট্টপুর, গাবতলী, হাড়িয়া, হাতকোপা, দত্তপাড়া, সাদীপুর, ইছাপাড়া, বালুয়াদিঘীর পাড়, বারদী ইউনিয়নের বারদী, সেনপাড়া, বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের হাড়িয়া গাবতলী, হাড়িয়া চৌধুরীপাড়া, মনারবাগ, উলুকান্দী, মোগরাপাড়া ইউনিয়নের মোগরাপাড়া, ষোলপাড়া সহ কয়েকটি এলাকায়। পাতি, কদমী আর বোম্বাই এই তিন প্রজাতির লিচুর ফলনই সোনারগাঁয়ের বাগানগুলোতে বেশি হয়ে থাকে। তবে এর মধ্যে পাতি লিচুর চাষই হয় সবচেয়ে বেশি। তা ছাড়া এ প্রজাতির লিচু সবচেয়ে আগে বাজারে আসে। এ ছাড়া কদমী, চায়না থ্রী, বারিফোর লিচুর চাষও করছেন অনেকেই।
সোনারগাঁ পৌরসভার ষোলপাড়া এলাকার লিচুচাষি হারুন অর রশিদ জানান, বাগান কয়েক ধাপে বিক্রি হয়। গাছে মুকুল আসার আগেই এবং লিচু গুটি হওয়ার পরে বাগান বিক্রি হয়। লিচু পাকার আগেও বেশ কয়েকবার পরিবর্তন হয় বাগানের মালিকানা। তবে অনেক বাগান মালিক লাভের আশায় বাগান বিক্রি না করে নিজেই শ্রম দেন। অনেক সময় খরার কারণে লিচুর আকার ছোট হয়ে যায়। আবার অনেক সময় কালবৈশাখী ঝড়ে লিচু বাগান ও লিচুর কুড়ি লণ। লণ্ড-ভণ্ড হয়ে যায়। তখন ক্ষতির মুখে পড়তে হয় চাষি ও ব্যবসায়ীদের।
সোনারগাঁ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা আবু সাঈদ তারেক জানান, সোনারগাঁয়ের লিচু আগে আসে এবং অত্যন্ত রসালো ও সুস্বাদু বিধায় এর চাহিদা অনেক বেশি। এ বছর যে পরিমাণ মুকুল এসেছে আশা করি ৬-৭ কোটি টাকা বিক্রি হবে। তিনি আরো জানান, উপ সহকারি কৃষি কর্মকর্তার ১ মাস আগে থেকেই বাগানে বাগানে গিয়ে পরিচর্যা, ভিটামিন, সার ও কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। বসতবাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে ১৪ হেক্টর জমিতে লিচু গাছ রয়েছে। আবহাওয়াও অনুকূলে আছে। আশা করছি প্রচুর ফলন আসবে।


আপনার মতামত জানান